বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২২, ০৮:০৫ পূর্বাহ্ন

আফ্রিকায় আবারো করোনা আর পঙ্গপালের হানা

এখনই সময় ডেস্ক / ৭২
আপডেট : রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২০, ৫:১০ পূর্বাহ্ণ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক, ঢাকাঃ মধ্য আফ্রিকায় দ্বিতীয়বারের মতো হানা দিয়েছে পঙ্গপাল। এবারের ছোট পোকাগুলো আরও অনেক বেশি আগ্রাসী। ছোট ছোট ক্ষতিকর পতঙ্গগুলো করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পর্যুদস্ত মহাদেশটির এখানে–সেখানে অবাধে ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রোগাসে শস্য সাবাড় করে দেওয়া পঙ্গপালকে দমন রীতিমতো দুরূহ হয়ে উঠেছে। এর ২০১৯ সালের শেষের দিকের ওই অঞ্চলে পঙ্গপালের উৎপাত দেখা যায়।

এই মুহূর্তে আফ্রিকার সবচেয়ে জনবহুল দেশ ইথিওপিয়ার পাশাপাশি ওই অঞ্চলের অর্থনৈতিক শক্তি কেনিয়া আর রাজনৈতিকভাবে পর্যুদস্ত সোমালিয়া পঙ্গপালের আক্রমণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বলা হচ্ছে, দ্বিতীয় দফায় হানা দেওয়া পতঙ্গগুলোর পাল প্রথমবারের চেয়ে ২০ গুণ বড়। জুন নাগাদ এগুলো চার শ গুণ বড় হয়ে যাবে।

ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় আমহারা এলাকায় পঙ্গপাল কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে কাজ করছেন সরকারি কর্মকর্তা মেসেরেট হাইলু। তিনি বলছেন, বন, চারণভূমি, আবাদি জমি, এমনকি জঙ্গলেও দেখা মিলেছে পঙ্গপালের।

২০১৯ সালের শেষ দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে এই পোকার বিস্তার চোখে পড়ে ইথিওপিয়া, তার প্রতিবেশী ইরত্রিয়া ও জিবুতিতে। সংখ্যায় কম হলেও একসময় তা ছড়িয়ে পড়ে সোমালিয়া, কেনিয়া, উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান আর তানজানিয়ায়।

গত ২৫ বছরে এত ব্যাপক আকারে পোকার আক্রমণ সামাল দেয়নি, এমন সরকারগুলো এই পরিস্থিতিতে যে হিমশিম খাবে—এটাই স্বাভাবিক। তাই পোকাগুলো মেরে ফেলতে পেস্টিসাইড, সুরক্ষামূলক জাপাকাপড়, ধোঁয়ার সাহায্যে আর উড়োজাহাজ থেকে জীবাণুনাশক ছড়ানোর জন্য রীতিমতো হুড়োহুড়ি শুরু করে দেয় আফ্রিকার দেশগুলো।

তবে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) কর্মকর্তা সিরিল ফেরান্ড মনে করেন, পঙ্গপাল দমনের জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ জোরদার করাটাই কঠিন।

পঙ্গপালের প্রথম দলটি মাটিতে যে ডিম রেখে গেছে, তা থেকে এরই মধ্যে বংশবিস্তার হচ্ছে। ছোট ছোট এই পোকা অনেক বেশি আগ্রাসী ভঙ্গিতে সাবাড় করে দিচ্ছে গাছপালা। এই পোকাগুলোই এখন ছড়িয়ে পড়ছে কেনিয়া, সোমালিয়া আর ইথিওপিয়ায়। এপ্রিলের শুরুতে পোকাগুলো আবার উগান্ডার পাঁচ বর্গকিলোমিটারে ছড়িয়ে পড়েছে।

ব্যাপক বংশবিস্তার কেনিয়ায়
ফেব্রুয়ারি থেকে মে, বর্ষা মৌসুমের স্বল্পতম সময়টুকুই কৃষকদের জন্য বীজ বপনের উৎকৃষ্ট সময়। সেভাবে বীজ বুনতে পারলে জুনে তারা বাম্পার ফলন পাবেন। গত কয়েক বছরের খরার পর আফ্রিকায় এবার বৃষ্টিটা ভালোই হয়েছিল। কিন্তু জলীয়বাষ্প আর আর্দ্রতা পোকার ডিম থেকে দ্রুত বাচ্চা ফোটার জন্য মোক্ষম সুযোগ করে দিয়েছে।

উত্তর ও মধ্য কেনিয়াতে সাধারণত কীটপতঙ্গের তেমন উপস্থিতি চোখে পড়ে না। গত ৭০ বছরে তারা কখনো পঙ্গপালের বিস্তার দেখেননি। অথচ এখন পঙ্গপাল ডিম ছেড়েছে সবখানে।

মধ্য কেনিয়ার উয়িঙ্গি শহরের জুড মুসিলি কুলিমা বলেন, মা পঙ্গপালগুলো এসে ডিম ছেড়ে চলে গেছে। দুই সপ্তাহ ডিমগুলো থেকে এখন পোকা বের হচ্ছে। এদের সংখ্যা মা পঙ্গপালের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। ছোট ছোট পোকাগুলো খেয়ে ফেলছে সবকিছুই। এমনকি এদের ছোবল থেকে চারণভূমির ঘাসও রক্ষা পাচ্ছে না।

দেরি নিয়ে যত দুশ্চিন্তা
পঙ্গপালের হানা থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে কীটনাশক, বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব বায়ো-পেস্টিসাইডের প্রয়োজন। আর তা পাওয়া যায় জাপান, নেদারল্যান্ডস ও মরক্কোর মতো দেশগুলোতে। কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণের বিস্তারের কারণে পণ্যবাহী উড়োজাহাজ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। আর পণ্য সরবরাহব্যবস্থায় বেড়েছে খরচও।

পঙ্গপাল নিয়ন্ত্রণে থাকা ডেজার্ট লোকাস্ট কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন ফর ইস্ট আফ্রিকার নির্বাহী পরিচালক ড. স্টিফেন জোকা বলেন, এই পরিস্থিতিতে পণ্য আমাদানি কমে গেছে। আর আপনি যদি জীবাণুনাশ স্প্রে ব্যবহারে দেরি করে ফেলেন, এতে পোকার বিস্তার ঘটতে থাকবে। এই পরিস্থিতিতে সংকটে পড়বে কেনিয়া।

সমস্যার এখানেই শেষ নয়। যে হেলিকপ্টারগুলো পঙ্গপালের গতিবিধির ওপর নজর রাখবে, সেগুলোর আফ্রিকায় পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। কানাডা থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রীও এখন পর্যন্ত পৌঁছায়নি। আর পাইলটরা আফ্রিকায় পা রাখার পরই তাদের যেতে হবে কোয়ারেন্টিনে। আর বুট, গগল, মাস্কসহ শহর এবং জনসাধারণের চলাচলগুলোতে ভাইরাসের বিস্তার রোধে ব্যবহার করা সুরক্ষাসামগ্রীগুলো আসে চীন থেকে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আঞ্চলিক মুখপাত্র জুডিথ মুলিংসে জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত তাদের কাছে সুরক্ষাসামগ্রীর মজুত পর্যাপ্ত। তবে সরবরাহের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে যেভাবে দেরি হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে সংকট দেখা দেবে।

এফএও কর্মকর্তা সিরিল ফেরান্ড বলছেন, আবাদি জমিতে ধানসহ অন্যান্য গাছগুলো যখন বাড়তে থাকে, পঙ্গপাল ঝাঁক বেঁধে হামলা চালাচ্ছে এতে। সব শস্যই এরা সাবাড় করে দিচ্ছে। এমনটা চলতে থাকলে শস্য উৎপাদন চলে যাবে শূন্যের কোঠায়।

এ পর্যন্ত এফএওর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পঙ্গপালের হানায় চরমভাবে পর্যুদস্ত হয়েছে ইথিওপিয়া। দেশটির দুই লাখ হেক্টর জমির ফসল চলে গেছে পোকার পেটে। আর শেষ করে ফেলেছে ১০ লাখ হেক্টরের বেশি চারণভূমির ঘাস। জাতিসংঘের সংস্থাটির আশঙ্কা, পঙ্গপালের কারণে দেশটির অন্তত লাখ দশেক মানুষ খাবারের সংকটে পড়বে।

আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পোকার কারণে ক্ষুধা আর করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউনের ফলে আফ্রিকায় দারিদ্র্যের ভয়াবহ চেহারা দেখা যেতে পারে।

আফ্রিকার খাদ্যনিরাপত্তা বিশ্লেষক জেসপার ওয়েইসিওয়া বলছেন, এর মধ্যে এ অঞ্চলের প্রায় আড়াই কোটি মানুষের জন্য খাবার সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। পঙ্গপালের আক্রমণ রোধ করতে ব্যর্থ হলে আরও ৫০ লাখ মানুষ খাবারের সংকটে পড়বে। এটি ঘটলে সাম্প্রতিক ইতিহাসে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের খাবারের কষ্টে পড়ার ঘটনা এটাই প্রথম ঘটবে।

তথ্যসূত্র: এফএও, বিবিসি এবং ইউএননিউজ


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরও খবর
Theme Customized By Theme Park BD
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: