বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২২, ০৭:৫১ পূর্বাহ্ন

ইলিশের সাতকাহন

এখনই সময় ডেস্ক / ৬৩
আপডেট : শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২০, ১২:৫৬ অপরাহ্ণ

শংকর লাল দাস :  ইলিশ মাছ পছন্দ করেন না, কিংবা পাতে তুলতে চান না। এমন বাঙালি কী আছেন? না! সত্যিই এমন বাঙালি খুঁজে বের করা বেশ মুশকিল। ঐতিহাসিক কাল থেকেই ইলিশ কেবল বাঙালির। আজ থেকে প্রায় ন’শো বছর আগে জীমূতবাহন তাঁর‘কালবিবেক’ গ্রন্থে এই বিখ্যাত মাছটির নাম দিয়েছিলেন ইলিশ। অনেকেরই ধারণা, এরও অনেক আগে থেকে ইলিশ কেবল বাঙালির। প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ মনে করতেন, বাংলা বর্ণমালার শিশুশিক্ষার বইয়ে‘আ’-তে যদি আম হয়, তা হলে‘ই-তে ইলিশ। আরেক বিখ্যাত লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তো লিখেছেনই, ইলিশের স্বাদ দেড় কিলো থেকে পৌনে দু’কিলোয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘দুধের স্বাদ যেমন ঘোলে মেটে না, তেমনই খাঁটি ইলিশের স্বাদের সঙ্গে অন্য কোনও কিছুর সমঝোতা চলে না’। সাহিত্যিক শঙ্করের ব্যাখ্যা একটু ভিন্নরকম। তাঁর কথায় মৎস্য সমাজে ইলিশ একমাত্র উপবীতধারী। তার দু’পিঠে যে দুটো সুতো থাকে, তার নাম পৈতা। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো আরেকটু এগিয়ে বাঙালি দাম্পত্যজীবনের সঙ্গেই ইলিশের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। বাঙালির বিয়ের পরবর্তী অবস্থাকে তিনি জালে পড়া ইলিশের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

মানুষ যেমন ভ্রমণপ্রিয়। তেমনি ইলিশও। তাই একে বলে মাইগ্রেটরি। ডিম পাড়ার জন্য সে ১২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পরিক্রমা করে নদীতে যেতে পারে। সে কারণেই ইলিশ পরিযায়ী মাছ।

কিছু দিন সাগরে, তো কিছু দিন নদীতে। নোনা জলের দেশে থাকে ইলিশ। সাগর যদি হয় তার শ্বশুরবাড়ি। সন্তানের জন্ম দিতে তবে ইলিশকে বাপের বাড়ি অর্থাৎ নদীতে আসতেই হয়। তাই মিষ্টি জলের নদী ইলিশের বাবার বাড়ি। বছরে দু’বার বর্ষা আর শীতে সে আসে।

টিপটিপ, ঝমঝম কিংবা রিমঝিম। বৃষ্টি যেমনই হোক, তার সঙ্গে ইলিশের ঘনিষ্টতা সেই আদিকালের। বর্ষা ছাড়া ইলিশ তেমন জমে না।বর্ষায় পাতে রুপোলি ইলিশের মজাই আলাদা। কখনও কড়কড়ে ভাজা, কখনও ভাপা, কখনও বা স্রেফ কালোজিরে দিয়ে ট্যালট্যালে ঝোল। সরিষা ইলিশ কিংবা ইলিশের দো পেঁয়াজা। হতে পারে টক আমড়া দিয়ে ইলিশ ঝোল। ইলিশের মাথা দিয়ে কচুর শাকের স্বাদও অনন্য। নাম আর পদ যাই হোক, ইলিশ তো ইলিশই। মেছো-বাঙালি পারলে যেন কাঁচাই ধুয়ে খায়।

শহরে বিশেষত কলকাতার দাদাদের হোটেলে অবশ্য নামের শেষ নেই। ইচ্ছেমতো পদের নাম বসিয়ে নিয়েছে। যেমন এ প্রজন্মের পছন্দ বোন-লেস-ইলিশেরা! এছাড়া দেদার বিকোচ্ছে মোচা ইলিশ, স্মোকড ইলিশ, লাললঙ্কা ইলিশ। বিভিন্ন প্রিপারেশন- ভিন্ন স্বাদ বলেই তারিয়ে উপভোগ করছেন সেখানকার ভোজনরসিক বাঙালি। মন কাড়ে আমতেল ইলিশও। আচারের তেল মাখানো গরম ভাতের সঙ্গে আমতেল ইলিশ পাতে তুলে দিচ্ছে রেস্তোরাঁ-কর্মীরা। ইলিশের ফিঙ্গার ফ্রাইও বিক্রি হচ্ছে পাল্লা দিয়ে।

নাম-পদ যাই হোক, শেষ অবদি ইলিশ কিন্তু আমাদেরই।

এখনও‘হালি’তে ইলিশ কিনতে না পারলে যেন স্বস্তি মেলে না। চার আঙুলে চারটি ইলিশ নিয়ে বাড়ি ফেরা। পথে পথে পথিকের জিজ্ঞাসু চোখে দাম জানতে চাওয়া। সবমিলেই ইলিশ বাঙালির।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরও খবর
Theme Customized By Theme Park BD
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: